
বিশেষ প্রতিনিধি, গফরগাঁও (ময়মনসিংহ):
ময়মনসিংহের দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ‘বেগম রাবেয়া মেমোরিয়াল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়’টি জাতীয়করণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। দক্ষিণ অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীদের উন্নত ও সরকারি শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টিকে দ্রুত সরকারি করার দাবি এখন সর্বমহলের।
ঐতিহ্য ও অবস্থানগত গুরুত্ব
উপজেলার ৪নং ইউনিয়নের সতরবাড়ী গ্রামে উঁচু ভূমিতে মনোরম পরিবেশে বিদ্যালয়টি অবস্থিত। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মরহুম আব্দুল মোনেম খানের সহধর্মিণী এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক শিক্ষা সচিব মরহুম শফিউল আলমের (সিএসপি) শাশুড়ি ‘রাবেয়া’র নামে ১৯৬৮ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনটি ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ ব্যবস্থাও বেশ উন্নত। চারপাশেই রয়েছে পাকা ও প্রশস্ত রাস্তা। এছাড়া সন্নিকটেই রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পাগলা থানা, সতরবাড়ী আখতারুজ্জামান দাখিল মাদরাসা (যা রাবেয়া বেগমের পুত্রের নামে প্রতিষ্ঠিত), সতরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লংগাইর ইউনিয়ন ভূমি অফিস, কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, সতরবাড়ী বাজার ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি স্থাপনা।
দক্ষিণাঞ্চলের বঞ্চনা ও দাবির যৌক্তিকতা
গফরগাঁও উপজেলা সদরে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হলেও দক্ষিণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত। আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং যাতায়াতের দূরত্বের কারণে অনেক অভিভাবক চাইলেও তাঁদের সন্তানদের উপজেলা সদরের সরকারি স্কুলে পড়াতে পারেন না। সবুজ-শ্যামল পরিবেশে অবস্থিত বেগম রাবেয়া মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়টির রয়েছে বিশাল প্রশস্ত খেলার মাঠ, দুই পাশে দুটি পুকুর এবং পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট একটি নদী। এমন চমৎকার পরিবেশের বিদ্যালয়টি সরকারি হলে এই অঞ্চলের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাছেই স্বল্প খরচে সরকারি শিক্ষার সুযোগ পাবে।
আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও সাফল্য
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি সুনামের সঙ্গে সুশিক্ষা বিস্তার করে আসছে। এখানকার অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উচ্চ পদে কর্মরত আছেন এবং অনেকেই সফলতার সাথে কর্মজীবন শেষে অবসরে আছেন। সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, আধুনিক শিক্ষার চমৎকার পরিবেশ রয়েছে এখানে।
বিদ্যালয়টিতে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য সম্পূর্ণ ক্যাম্পাস সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত।
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য ডিজিটাল হাজিরা মেশিন ও সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট (Wi-Fi) ব্যবস্থা।
মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনার জন্য ল্যাপটপ।
শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা (ফার্স্ট এইড) সামগ্রী।
বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য ডিজিটাল ফিল্টার মেশিন।
শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট স্কুল ড্রেস, পরিচয়পত্র এবং একটি চৌকস স্কাউট টিম।
বিদ্যালয়ের সামনে দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান এবং খেলাধুলার সু-ব্যবস্থা।
দক্ষ ও সুশিক্ষিত শিক্ষকমণ্ডলীর পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের একটি দল নিয়মিত বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে তদারকি ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন
স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের শুভাকাঙ্ক্ষীরা জানান, একজন সাবেক শিক্ষা সচিব ও গভর্নরের পরিবারের স্মৃতিবিজড়িত এই বিদ্যালয়টির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক শিক্ষার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এটি জাতীয়করণ না হওয়া এ অঞ্চলের মানুষের জন্য হতাশার। মানবিক দিক এবং বৃহত্তর দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের মানুষের শিক্ষাগত উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবিলম্বে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সু-ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।
মন্তব্য করুন