
ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলের গভীরে লুকানো শত শত মাটির কাঠামো আবিষ্কার করেছেন গবেষকরা, যা সম্ভবত লক্ষ লক্ষ মানুষের একটি প্রাচীন সভ্যতা তৈরি করেছিল। স্পেনের ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি স্পেন, ফিনল্যান্ড, ব্রাজিল ও ডেনমার্কের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী পরিচালনা করেছেন। বিজ্ঞানীরা লাইডার (লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) নামক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘন জঙ্গলের উপরিভাগ স্ক্যান করেছেন, যার মাধ্যমে গাছপালা না কেটে বিশাল এলাকা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষক দলটি চার হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে জরিপ চালিয়ে ৪৩২টি ভূ-লিপি শনাক্ত করেছে, যেগুলোর অধিকাংশই আগে কখনো নথিভুক্ত করা হয়নি এবং ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। আমাজন জিওগ্লিফস ইনস্টিটিউটের সভাপতি এবং দলের অন্যতম সদস্য জীবাশ্মবিজ্ঞানী আলসেউ রানজি জানান, গ্রিসে যখন পিথাগোরাস তার উপপাদ্য বিকশিত করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই এই লোকেরা আমাজনে বিশাল জ্যামিতিক শিল্পকর্ম তৈরি করছিল।
গবেষকদের অনুমান, অ্যাকুইরি সভ্যতা নামক এই নির্মাতারা প্রায় এক লাখ ৮৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দে এর সর্বোচ্চ সমৃদ্ধির সময়ে এখানে প্রায় ৩০ লাখ বাসিন্দা থেকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষণাপত্রের সহ-লেখক মার্টি পার্সিনেন উল্লেখ করেন যে, এটি আমাজনে প্রথম সত্যিকারের উচ্চাভিলাষী লাইডার জরিপ ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভূ-লিপিগুলো স্থায়ীভাবে বসবাসের স্থান না হয়ে বরং আনুষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করত এবং মানুষ এগুলোকে সমাবেশস্থল হিসেবে ব্যবহার করত। রানজি মনে করেন, এই লোকেরা সম্ভবত শান্তিতে বসবাস করতেন কারণ এর পেছনে এত শ্রম উৎসর্গ করা থেকে বোঝা যায় যে তাদের কোনো বড় শত্রু ছিল না। পার্সিনেন জানান যে তারা কখনো রেইন ফরেস্টকে বৃক্ষহীন প্রান্তরে রূপান্তরিত করেননি এবং ভুট্টা, স্কোয়াশ ও ম্যানিওক চাষের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ছিল বন ততটুকুই পরিষ্কার করেছিলেন।
আনুমানিক ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে হঠাৎ করে জিওগ্লিফ নির্মাণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যার কারণ স্পষ্ট নয়। রানজির মতে, নবম শতাব্দী হয়তো কোনো বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটের সময় ছিল, যা মায়া সভ্যতার পতনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই গবেষণা দীর্ঘদিনের এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করছে যে আমাজন বনাঞ্চল একসময় মানব বসতিহীন অরণ্য ছিল। গবেষকদের মতে, আমাজনে যা দেখা যায় তা কোনো বিশাল প্রাকৃতিক অরণ্য নয়, বরং মানুষের কর্মকাণ্ড দ্বারা গঠিত এক বিশাল ঐতিহাসিক উদ্যান।
মন্তব্য করুন