
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি এবং নজিরবিহীন প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডারদের পকেট ভারী করতে জোরপূর্বক গঠিত একটি ‘অবৈধ’ কমিটিকে কেন্দ্র করে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই কমিটির কোনো অফিশিয়াল বৈধতা না থাকলেও ভূয়া সীল ও জাল নথিপত্র তৈরি করে ছাত্রছাত্রীদের উপবৃত্তির টাকা এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ চুপিসারে পকেটস্থ করেছে স্বৈরাচারের দোসররা।
এই চরম জালিয়াতি ও কোটি টাকার দুর্নীতির খবর ফাঁস হওয়ার পর ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে জননেতা ওয়াদুদ ভূইয়ার নির্মিত একটি টিনশেড ভবনকে মাদক ও নানাবিধ অপকর্মের আখড়ায় পরিণত করেছিল ফ্যাসিস্ট দোসররা। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের দিনে নিজেদের অপকর্মের প্রমাণ ও নথিপত্র ধামাচাপা দিতে ওই টিনশেড ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয়ের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের নামে-বেনামে আসা উপবৃত্তির টাকা সম্পূর্ণ গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা এই অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গেলে বেরিয়ে আসে জালিয়াতির আরও ভয়ঙ্কর চিত্র। দেখা যায়, সরকারি কোনো অনুমোদন ছাড়াই নিজেদের মতো একটি কমিটি বানিয়ে, ভূয়া সীল তৈরি করে আব্দুল হাকিম নামের এক ব্যক্তিকে ‘সভাপতি’ সাজানো হয়েছে। এই কাল্পনিক সভাপতির সীল ব্যবহার করে সরকারি বরাদ্দের টাকা নামমাত্র কাজ দেখিয়ে সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন:
উপজেলা শিক্ষা অফিসার (মাটিরাঙ্গা) ঝর্ণা চাকমা: “বর্তমানে এই স্কুলে আব্দুল হাকিম নামের কোনো কমিটির সভাপতির অস্তিত্ব নেই। নিয়মানুযায়ী এখন সকল স্কুল কমিটির দায়িত্বে আছেন এটিও (সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার)।”
অভিযুক্ত ‘সভাপতি’ আব্দুল হাকিম: “আমি তো নিজ থেকে সভাপতি হইনি। স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ও বাকি শিক্ষকেরা সবাই মিলে আমাকে জোর করে সভাপতি বানিয়েছেন।”
সাবেক প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম: “কমিটি গঠনের বিষয়টি সত্য, তবে আমার কাছে কোনো ডকুমেন্টস বা প্রমাণ নেই। রেজিস্ট্রার খাতা স্কুলেই থাকার কথা। আমার বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটার জবাব আমি ডিডি (উপ-পরিচালক) স্যারের কাছে লিখিতভাবে দিয়েছি।”
বর্তমান প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদীন: “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এই তথাকথিত কমিটির কোনো অফিশিয়াল রেজিস্ট্রার খাতা পাইনি। শুধু আব্দুল হাকিম নামের ওই ব্যক্তির একটি সীল পেয়েছি।”
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর আলটিমেটাম,
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাল-জালিয়াতির আখড়া বানিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও বিদ্যালয়ের সুনাম বিনষ্ট করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন সাধারণ মানুষ। অভিভাবক ও এলাকাবাসীর দাবি, অনতিবিলম্বে এই ‘টাকা আত্মসাৎকারী সিন্ডিকেট’ এবং ভূয়া সীল ব্যবহারকারী ফ্যাসিস্টের দোসরদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
মন্তব্য করুন